শীতের সকালে কুয়াশাভেজা মেঠোপথে এখন আখমাড়াই যন্ত্রের একটানা শব্দ। সেই সাথে বাতাসে ভাসছে আখের রস আর নতুন গুড়ের মউ মউ গন্ধ। মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার প্রত্যন্ত মিঠিপুর গ্রামে এভাবেই গত এক শতাব্দী ধরে টিকে আছে আখ চাষ ও রস সংগ্রহের প্রাচীন ঐতিহ্য। আধুনিকতার ছোঁয়ায় মহিষের টানা কলের পরিবর্তে এখন ডিজেলচালিত ইঞ্জিন জায়গা করে নিলেও, হারায়নি আখের সেই চিরায়ত আস্বাদ।
রাজনগরের কামারচাক ইউনিয়নের মনু নদ ঘেঁষা এই গ্রামটির নামের সাথে জড়িয়ে আছে আখের রসের মিষ্টতা। একসময় শতাধিক পরিবার এই পেশায় থাকলেও বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৫ থেকে ৭টি পরিবার। মূলত উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং শ্রমিক সংকটের কারণে অনেকে বিমুখ হলেও, সঠিক বাজারমূল্য পাওয়ায় কোনো কোনো কৃষক এখনো লাভের মুখ দেখছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঠে নেমে পড়ছেন চাষিরা। কেউ আখ কাটছেন, কেউ যন্ত্রে মাড়াই করে রস সংগ্রহ করছেন। সেই রস বড় টিনের পাত্রে ভরে পাইকাররা ছুটে চলেন দূরদূরান্তের গ্রামে। স্থানীয়ভাবে প্রতি লিটার রস ৬০ টাকা এবং প্রতি কেজি লালিগুড় ২২০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
৩৫ বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত চাষি সিরাজুল ইসলাম গেন্দু জানান, তিন কিয়ার জমিতে আখ চাষে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। তবে ইতোমধ্যে এক লাখ টাকার রস ও গুড় বিক্রি করেছেন এবং মৌসুম শেষে আরও দেড় লাখ টাকা লাভের আশা করছেন। তিনি বলেন, “বাবার হাত ধরে এই কাজে আসা। যান্ত্রিক যুগে পরিশ্রম বাড়লেও পূর্বপুরুষের এই ঐতিহ্য আমি আমৃত্যু আঁকড়ে ধরে রাখব।”
তবে কৃষি শ্রমিকের দুষ্প্রাপ্যতা ও উন্নত প্রযুক্তির অভাবে নতুন প্রজন্ম এই চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম। তবুও প্রবীণদের স্মৃতিতে আজও অমলিন আখের রসের পিঠা আর গুড়ের মিষ্টি খিচুড়ির উৎসব।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, “জেলায় সীমিত আকারে আখ চাষ হলেও সমতল ভূমিতে এর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সাথী ফসল হিসেবে আখের সাথে অন্য সবজি চাষের মাধ্যমে কৃষকদের লাভবান করতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”