রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের (আরএনপিপি) প্রথম ইউনিটে উৎপাদন শুরু করতে জোর প্রস্তুতি চলছে। উৎপাদন শুরুর আগের সব ধাপগুলো একে একে দ্রুত সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। এর আগে যন্ত্রাংশের ত্রুটির কারণে এ প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের উৎপাদন শুরু করার কাজ পিছিয়ে যায়। গত রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেলে প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া প্রকল্পটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি। তবে এর পরেও আরও কিছু প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করে উৎপাদনে যেতে হবে। এর আগে গত ৮ অক্টোবর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমতি পাওয়া যায়। সেফটি রিলিফ ভালভের সমস্যা সমাধানের পর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা) এ অনুমোদন দেয়।
বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে এই নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়াকে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের প্রেশারাইজার সেফটি রিলিফ ভালভের সমস্যার কারণে এ অনুমোদনটি আটকে ছিল যার ফলে বিক্রিয়াও শুরু করা যাচ্ছিল না। রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ টিম এসে সেই সমস্যার সমাধান করে এবং বিভিন্ন পরীক্ষায় এটি উত্তীর্ণ হয়। রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের প্রচেষ্টায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর সেফটি ভালভের উচ্চচাপ পরীক্ষা সফল হয়। এরপর রোববার ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ শুরু করা হয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের পর গত আগস্টের শেষ অথবা সেপ্টেম্বরের শুরুতে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার কথা ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী সব প্রস্তুতি ধাপে ধাপে সম্পন্ন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ার দিকে প্রকল্পকে অগ্রসর করা হচ্ছিল। কিন্তু গত ৩ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ভালভ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করছে না। এ কারণে এই মুহূর্তে উৎপাদনে যাওয়া যাচ্ছে না।
গত ২৮ এপ্রিল রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা শুরু হয়। এ পর্যায়ে চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য ছিল। বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা চালিয়ে এখন ‘বি’ স্টেজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে দুটি সেফটি ভালভের সমস্যার কারণে পরবর্তী ‘সি’ স্টেজে যাওয়া যাচ্ছে না বলেও তিনি জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রতিটি ধাপেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যে যন্ত্রাংশের সমস্যা দেখা দিয়েছিল সেটি মূলত দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার অংশ। এটি পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ বা প্রেশারাইজার সেফটি রিলিফ ভালভ নামে পরিচিত।
সেফটি রিলিফ ভালভ চুল্লিতে প্রেশারাইজারের উপরের অংশে স্থাপন করা থাকে। এগুলোর প্রধান কাজ হলো চুল্লির প্রাথমিক শীতলীকরণ ব্যবস্থাকে অতিরিক্ত চাপ থেকে সুরক্ষা দেওয়া। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রযুক্তিতে পারমাণবিক চুল্লির নির্দিষ্ট তাপ ও চাপ বজায় রাখতে এই ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চাপ নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেড়ে গেলে ভালভগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায় এবং উচ্চচাপের বাষ্প একটি রিলিফ ট্যাংকে ছেড়ে দেয়।
চাপ আবার নিরাপদ মাত্রায় নেমে এলে ভালভগুলো বন্ধ হয়ে বাষ্পের নির্গমন বন্ধ করে দেয়। এর ফলে প্রাথমিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা আবার আবদ্ধ অবস্থায় ফিরে আসে। রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরীক্ষা নিরীক্ষার সময় এ ধরনের দুটি ভালভ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করছিল না।
এর পর সমস্যা সমাধানের জন্য গত ২২ সেপ্টেম্বর রাশিয়া থেকে ৫ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ টিম রূপপুর প্রকল্পে আসে। এই বিশেষজ্ঞদের প্রচেষ্টায় সেফটি ভালভের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম গত ৯ অক্টোবর মস্কোতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কর্পোরেশন রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এ বৈঠকে প্রকল্পের কাজের সার্বিক অগ্রগতি ও প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়সীমা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে অ্যালেক্সি লিখাচেভ জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট (VVER-1200 রিঅ্যাক্টর) হতে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ২০ নভেম্বর থেকে মাসের শেষ নাগাদ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে আশা করছি।
তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া বা ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ সফল হওয়ার পর আরও অনেকগুলো ধাপ পার হতে হবে। অনেকগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হতে হবে। একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো ধাপে ধাপে চলবে। প্রতিটি ধাপ সফলভাবে উত্তীর্ণ হতে হবে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার আগে আরও দুটি নিয়ন্ত্রক অনুমোদন লাগবে। ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটির পর চুল্লির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং ধাপে ধাপে শক্তি বাড়ানোর কাজ চলবে।
সব পরীক্ষা পরিকল্পনা মতো এগোলে প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হতে পারে। সেটা নভেম্বরের শেষ নাগাদ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে।
আবার এসব পরীক্ষা নিরীক্ষা চলাকালে ছোটখাটো কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতিও ধরা পড়ে। সামান্য কিছু ত্রুটিও ধরা পড়লে সে বিষয়গুলো সমাধান করে এগোতে হয়। এখন পর্যন্ত যে অবস্থায় রয়েছে সামনের দিকে অগ্রসর হতে নতুন করে কোনো সংকট তৈরি না হলে চলতি বছর শেষের দিকে অর্থাৎ চলতি বছর ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে দেওয়া সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা ধরে রাখছেন। তবে ছোটখাটো সমস্যাগুলোর ঝুঁকি সব সময় থেকে যায় এ কারণেই আগে থেকে সময় নির্দিষ্ট করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না বলেও সূত্রগুলো জানায়।
রাশিয়ার প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মিত হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে দেশটির রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের প্রকৌশল বিভাগ অ্যাটমোস্ট্রয়। এ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রকল্পটির দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও শেষ পর্যায়ে। আগামী বছরই দ্বিতীয় ইউনিটে ফুয়েল লোড করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে। এ প্রকল্পের ইউনিট দুটিতে রাশিয়ার সর্বশেষ প্রযুক্তির ৩জি প্লাস ভিভিইআর ১২০০ রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হয়েছে। দুটি ইউনিটের প্রত্যেকটিতে ১২০০ মেগাওয়াট করে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, আমরা তো চাচ্ছি যত দ্রুত সম্ভব উৎপাদনে যাওয়ার। সবকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ধাপে ধাপে অগ্রসর হচ্ছে। সংকট যেটা ছিল সেটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে, প্রগ্রেস খুব ভালো।
আগামী মাসে প্রথম ইউনিট উৎপাদনে নেওয়া সম্ভব হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়গুলো ওই ভাবে ঠিক বলা যায় না। বিভিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এগোতে হয়। সে অনুযায়ী সবকিছু এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব উৎপাদনে যেতে পারব বলে আশা করছি।