ঢাকা, বুধবার ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৫, ১৪ই ফাল্গুন ১৪৩১

মাগুরার ঐতিহ্যবাহী বটগাছ: ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মেলার উৎসব

আহমেদ শাহেদ | প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ ০৪:০৪:০০ অপরাহ্ন | জাতীয়

বাংলাদেশের মাগুরা জেলার ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ঘুল্লিয়া গ্রামের সুবিশাল বটগাছ। দেশের অন্যতম বৃহৎ এই বটগাছটির বিস্তৃতি প্রায় এক একর জুড়ে, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য আকর্ষণ। শুধু প্রাকৃতিক নয়, এই গাছের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু বছর ধরে পালিত এক ঐতিহ্যবাহী মেলা ও ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা, যা স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্তের মানুষকেও আকর্ষণ করে।

এই বটগাছের সঠিক বয়স সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে স্থানীয়রা মনে করেন এটি অন্তত দুইশ বছরের পুরোনো। বটগাছটির ছায়ায় রয়েছে একটি পুরাতন কালী মন্দির, যা এখানকার হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। এই মন্দির ঘিরে প্রায়ই ধর্মীয় কার্যক্রম ও পূজা-অর্চনার আয়োজন করা হয়, যা এখানকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে।

2-3242

মাগুরা শহর থেকে মহম্মদপুর রোড ধরে বিনোদপুর বাজার পর্যন্ত যেতে হয়। সেখান থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঘুল্লিয়া বাজার। এই বাজারের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে বিশালাকৃতির এই বটগাছ, যা স্থানীয়দের কাছে পরিচিত এক মিলনস্থল হিসেবে। পর্যটকদের জন্য স্থানটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়, তবে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে এখনো পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন তেমনভাবে হয়নি।

প্রতিবছর মাঘ মাসের ৭ তারিখে এই স্থানে আয়োজিত হয় ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা ও মেলা। এটি শুধু বিনোদনের জন্য নয়, বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

এই প্রতিযোগিতায় মাগুরাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ঘোড়সওয়ারেরা অংশ নেন। ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিযোগিতা এখনো দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশাল প্রান্তর জুড়ে দর্শকরা ভিড় করেন প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে। প্রতিযোগিতায় সাধারণত দেশীয় প্রজাতির ঘোড়াগুলো অংশ নেয় এবং সেগুলোর প্রশিক্ষণ, খাদ্যাভ্যাস ও যত্ন সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের আলাদা প্রস্তুতি নিতে হয়।

মেলাটি স্থানীয়দের জন্য শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, এটি ব্যবসা-বাণিজ্যেরও এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। মেলায় বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প, গ্রামীণ খেলনা, মিষ্টান্ন ও খাদ্যপণ্যের দোকান বসে। সেই সঙ্গে নাগরদোলা, সার্কাস ও বিভিন্ন যান্ত্রিক খেলার আয়োজনও থাকে, যা শিশুদের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয়। এছাড়াও, ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা, পুতুল নাচ ও যাত্রাপালার আয়োজনও করা হয়, যা মেলাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

Untitled-9-42

এত বড় এবং পুরোনো একটি বটগাছ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। এটি শুধু প্রকৃতির দান নয়, বরং মাগুরার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। পর্যটকদের জন্য এখানে আরও উন্নত সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা গেলে এটি একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের উচিত এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া। এছাড়াও, জায়গাটিকে একটি ইকো-ট্যুরিজম স্পট হিসেবে গড়ে তুললে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বটগাছ শুধু একটি ঐতিহ্যের প্রতীক নয়, এটি পরিবেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর বিশাল শাখা-প্রশাখা ও ঘন পত্রপল্লব গরমের দিনে প্রচুর ছায়া দেয় এবং বায়ু বিশুদ্ধ রাখতে সাহায্য করে। এই গাছটি বহু প্রজাতির পাখি, কীটপতঙ্গ ও ছোট প্রাণীদের আবাসস্থল হিসেবেও কাজ করে। তাই, একে সংরক্ষণ করা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

ঘুল্লিয়ার বিশাল বটগাছ শুধু একটি গাছ নয়, এটি একটি ইতিহাস, একটি সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগের অংশ। এর নিচে শত শত মানুষের মিলন, পূজা-অর্চনা, ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা এবং মেলার প্রাণবন্ত আয়োজন বছরের পর বছর ধরে এক অনন্য ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে। মাগুরার এই প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন ভবিষ্যতেও টিকে থাকুক, এটাই সকলের কাম্য।