রাজধানীর যানজট কমানো, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে চারটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ এলাকার বাস টার্মিনাল স্থানান্তর, পুরোনো ৩১টি সড়ক রুট সংস্কার এবং অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ন। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং বাস মালিক সমিতির প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এসব উদ্যোগের বিষয়ে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উদ্যোগগুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর সড়কে যানবাহনের চাপ কমানো, গণপরিবহনের চলাচল ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এর সুফল পেতে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, বাস্তবায়নের সময়সীমা, বিকল্প পরিবহনের ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসনে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো পদক্ষেপ নিলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া কঠিন। পুরোনো বাস অপসারণ, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, সড়ক রুট সংস্কার এবং অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ—সব উদ্যোগকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় বাস্তবায়নের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এ ক্ষেত্রে যাত্রীদের ভোগান্তি কমানো, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করাই হবে প্রধান লক্ষ্য।
রাজধানীর যানজট এখন শুধু যাতায়াতের দুর্ভোগ নয়; এটি নগর অর্থনীতি, কর্মঘণ্টা, জ্বালানি ব্যয়, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষকে দীর্ঘ সময় সড়কে কাটাতে হয়। এতে উৎপাদনশীলতা কমে ও নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন সড়ক ও উড়ালসড়ক নির্মাণ করে ঢাকার যানজটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। বিদ্যমান সড়কের কার্যকর ব্যবহার, বাসের রুট ও চলাচল ব্যবস্থাপনা, যানবাহনের মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহনের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি।
রাজধানীর সড়কে চলাচলকারী পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন বাসের একটি অংশ যান্ত্রিক ত্রুটি, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনের কারণে সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এ অবস্থায় ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গণপরিবহনের মান উন্নয়নের একটি পদক্ষেপ হতে পারে।
পুরোনো বাস সরিয়ে নেওয়ার ফলে গণপরিবহনের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে। এ কারণে বিকল্প বাসের ব্যবস্থা, যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা যাচাই এবং পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে চালকদের প্রশিক্ষণ, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা এবং যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। নতুন বাস যুক্ত করার পরিকল্পনা থাকলে সেগুলোর অর্থায়ন, পরিচালন ব্যয় ও পরিবেশগত সুবিধাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী ও গুলিস্তানসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাসের চাপ, যাত্রী ওঠানামা, পার্কিং এবং আন্তঃজেলা বাসের প্রবেশ ও বহির্গমন নগর চলাচলে প্রভাব ফেলে। এসব এলাকার টার্মিনাল স্থানান্তর বা ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা হলে কেন্দ্রীয় সড়কে বাসের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে টার্মিনাল স্থানান্তর শুধু বাস রাখার স্থান পরিবর্তনের বিষয় নয়। নতুন টার্মিনালের অবস্থান, সড়ক যোগাযোগ, যাত্রীদের যাতায়াতের সময়, ভাড়া, নিরাপত্তা এবং অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে সংযোগ বিবেচনায় নিতে হবে। শহরের প্রান্তে টার্মিনাল স্থানান্তর করা হলেও সেখান থেকে গন্তব্যে যাওয়ার পর্যাপ্ত বাস, মেট্রোরেল বা অন্যান্য পরিবহন সংযোগ না থাকলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে।
আন্তঃজেলা বাসের যাত্রা শুরু ও শেষের স্থান এবং মহানগরীর অভ্যন্তরীণ বাস চলাচলের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। টার্মিনালে প্রবেশ ও বের হওয়ার নির্দিষ্ট পথ, যাত্রী ওঠানামার স্থান, বাসের অপেক্ষমাণ জায়গা এবং পার্কিংয়ের ব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে নির্ধারণ করা গেলে আশপাশের সড়কে চাপ কমানো সম্ভব।
রাজধানীর পুরোনো ৩১টি সড়ক রুট সংস্কারের উদ্যোগ গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংস্কারের আওতায় কোন কোন রুট রয়েছে এবং কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
রুট সংস্কার বলতে শুধু সড়কের উপরিতল মেরামত নয়। বাস চলাচলের পথ, যাত্রী ওঠানামার স্থান, স্টপেজের অবস্থান, সংযোগকারী সড়ক এবং যানবাহনের প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ঢাকার বিভিন্ন সড়কে একই পথে একাধিক বাস কোম্পানির প্রতিযোগিতা, নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে বাস থামানো এবং যাত্রী তোলার জন্য হঠাৎ লেন পরিবর্তনের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়। আবার কিছু এলাকায় যাত্রীর তুলনায় বাসের সরবরাহ কম থাকায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। রুট সংস্কারের পরিকল্পনায় এসব সমস্যা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।