ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৭ সদস্যের জোটের ১৫টি দেশেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে। এসব দেশ বাংলাদেশের পোশাকের বড় বাজার। যেসব দেশে রপ্তানি বেড়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগ তুলনামূলক ছোট বাজার। সমকাল এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করে জোটগতভাবে ইইউ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৫০ শতাংশের বেশি আসে এই বাজার থেকে।
তবে গত অর্থবছরে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।
ইইউতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পোশাকের বাজার জার্মানি। একক দেশ হিসেবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য।
কোনো কোনো বছর জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। আগের অর্থবছরের ৪৯৫ কোটি ডলার থেকে রপ্তানি নেমে এসেছে ৪৩৮ কোটি ডলারে।
জার্মানিতে বাংলাদেশের ওভেন পোশাকের (শার্ট, প্যান্ট) তুলনায় নিট পোশাকের (টি-শার্ট, গেঞ্জিজাতীয় পণ্য) রপ্তানি বেশি। তবে গত অর্থবছরে নিট পোশাকের রপ্তানিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ খাতে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ, যেখানে ওভেন পণ্যের রপ্তানি কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। এরপরও মোট রপ্তানিতে নিট পণ্যের অংশই বেশি ছিল। গত অর্থবছরে জার্মানিতে নিট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ২৬৮ কোটি ডলার এবং ওভেন পণ্য ১৭০ কোটি ডলার।
ইইউর তৃতীয় বৃহত্তম বাজার ফ্রান্সেও রপ্তানি কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ। আগের অর্থবছরের ২১৬ কোটি ডলার থেকে নেমে এসেছে প্রায় ১৯৭ কোটি ডলারে। দেশটিতে নিট পোশাকের রপ্তানি কমেছে ১১ শতাংশ, আর ওভেন পণ্যের রপ্তানি কমেছে ৫ শতাংশ।
চতুর্থ বৃহত্তম বাজার ইতালিতেও একই চিত্র। সেখানে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ। আগের অর্থবছরের ১৫৪ কোটি ডলার থেকে কমে হয়েছে ১৪২ কোটি ডলার। এখানেও ওভেনের তুলনায় নিট পোশাকের রপ্তানি বেশি হারে কমেছে। ইউরোপে নিট পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, নিট পণ্যে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের হার গড়ে প্রায় ৯০ শতাংশ, যা ওভেনের তুলনায় অনেক বেশি। উৎপাদনের স্থানীয় প্রক্রিয়া বেশি হওয়ায় গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ কিংবা শ্রমিক অসন্তোষের মতো যেকোনো সংকটের প্রভাব আগে পড়ে নিট খাতে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত অতিরিক্ত শুল্কের কারণে বৈশ্বিক রপ্তানি বাজার সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন বাজারের বিকল্প হিসেবে চীন ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো ইইউ বাজারে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। অন্যদিকে দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও কমেছে।
ইইউর অন্যান্য বড় বাজারের মধ্যে ডেনমার্কে রপ্তানি কমেছে ১০ শতাংশ। আগের অর্থবছরের ১০৪ কোটি ডলার থেকে কমে হয়েছে ৯৪ কোটি ডলার। বেলজিয়ামে ৫৫ কোটি ডলার থেকে কমে হয়েছে ৫৩ কোটি ডলার, যা প্রায় ৫ শতাংশ হ্রাস। চেক রিপাবলিকে রপ্তানি ৩২ কোটি ডলার থেকে কমে ৩১ কোটি ডলারে নেমেছে। আয়ারল্যান্ডে ২৫ কোটি ডলার থেকে কমে হয়েছে ২৩ কোটি ডলার, অর্থাৎ ১০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি পতন হয়েছে রোমানিয়ায়, যেখানে রপ্তানি ২০ শতাংশ কমে ২৩ কোটি ডলার থেকে ১৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। এ ছাড়া পর্তুগাল, স্লোভাকিয়া, গ্রিস, ক্রোয়েশিয়া, ফিনল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ ও মাল্টাতেও রপ্তানি কমেছে।
তবে ইইউর দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার স্পেনে রপ্তানি বেড়েছে ৬ শতাংশ। আগের অর্থবছরের ৩৪০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৬০ কোটি ডলার। এ ছাড়া নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, স্লোভেনিয়া, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, লাতভিয়া, হাঙ্গেরি, সাইপ্রাস ও বুলগেরিয়াতেও রপ্তানি বেড়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৯০৬ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৭১ কোটি ডলার। ফলে এক বছরে রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ। এর প্রভাবে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানিতে ইইউর অংশও কমে ৪৯ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৫০ দশমিক ১০ শতাংশ।