ঢাকা

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫টি লিফট বিকল, রোগীর দুর্ভোগ চরমে

টাঙ্গাইল ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের জন্য বরাদ্দকৃত ১২টি লিফটের ৫টি বিকল থাকায় রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে এই লিফট বিড়ম্বনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

চিকিৎসাসেবা নিতে আসা অধিকাংশ রোগী ও তাঁদের স্বজনদের লিফটের জন্য হাসপাতালের বিভিন্ন ফ্লোরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। লিফট বিকলের বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গণপূর্ত বিভাগের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব সেরেছে।

১৯১৪ সালে স্থাপিত টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবকাঠামো ও আধুনিক সুবিধার প্রত্যাশা থাকলেও হাসপাতালটির সেবা ব্যবস্থাপনার মান নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ভুক্তভোগীদের। জনবল সংকট, অবকাঠামোগত সমস্যা, পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি, চিকিৎসক-স্টাফদের অনুপস্থিতি এবং লিফট বিকল থাকার মতো বিষয় নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের নিচতলায় লিফটগুলোর সামনে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দীর্ঘ লাইন।

তাঁরা জানান, ১৫ তলা হাসপাতালে বিভিন্ন ফ্লোরে যেতে লিফটের কোনো বিকল্প নেই। তাই তাঁরা মুমূর্ষু রোগী নিয়ে লিফটের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে হাসপাতালের পঞ্চম তলায় গিয়ে দেখা যায়, গুরুতর অসুস্থ শম্ভুনাথ পাল লিফটের জন্য অপেক্ষা করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফ্লোরে পড়ে রয়েছেন। স্বজনেরা তাঁকে খবরের কাগজ দিয়ে বাতাস করছেন। স্বজনেরা জানান, শম্ভুনাথ পাল এসেছেন রেডিওলজি বিভাগে। ডাক্তার দেখানোর পর নিচতলায় নামতে লিফটের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তাঁরা। এমতাবস্থায় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

বহুতল হাসপাতাল ভবনে রোগী, স্বজন ও হাসপাতালের কর্মীদের জন্য লিফট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগী, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগী, বয়স্ক ব্যক্তি ও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য লিফটের বিকল্প খুবই সীমিত।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বহুতল ভবনের বেশির ভাগ লিফট প্রায়ই নষ্ট থাকে। ফলে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তির শেষ নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমানে হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত ৭৪০ জন ডাক্তার, স্টাফ ও নার্সের বিপরীতে মাত্র ৩২২ জন জনবল কর্মরত রয়েছেন। ৫০০ শয্যার বিপরীতে হাসপাতালে ৮৪০ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। অতিরিক্ত রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সামলাতে অপ্রতুল জনবল নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও নার্সদের।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ফারুক হোসেন, আনিসুর রহমান ও সালমা বেগম জানান, লিফটের জন্য ৩০ মিনিট ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, প্রচুর ভিড় আর লম্বা লাইন থাকায় এখনো ডাক্তার দেখাতে পারিনি। মুমূর্ষু রোগী নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক রোগীর স্বজন অভিযোগ করে বলেন, আজকে আমার মার যদি গুরুতর কিছু হয়, সেটা এই লিফটের কারণেই হবে। অপর এক অসুস্থ রোগী সকাল ১০টায় এসে লিফটের ভিড় ও লম্বা লাইনের কারণে বেলা ২টায়ও ডাক্তার দেখাতে পারেননি।

এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, হাসপাতালের ১২টি লিফটের মধ্যে বর্তমানে ৫টি লিফট বিকল রয়েছে। লিফট মেরামতের বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগকে বারবার চিঠি দেওয়া সত্ত্বেও তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। এছাড়া ১২টি লিফট রক্ষণাবেক্ষণের পুরো দায়িত্ব গণপূর্ত বিভাগের। গণপূর্ত বিভাগ 'ওটিজ' ও 'ক্রিয়েটিভ' এই দুটি কোম্পানির মাধ্যমে লিফটগুলো সারা বছর রক্ষণাবেক্ষণ করিয়ে থাকে।

তিনি আরও জানান, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সমস্ত ক্রয় ই-জিপির (e-GP) মাধ্যমে হয়, এখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো হাত নেই। তিনি আরও বলেন, অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সুপারভাইজারগণ অভিযোগগুলো মীমাংসা করে থাকেন। এছাড়া হাসপাতালে ৭৪০ জন জনবলের বিপরীতে মাত্র ৩২২ জন থাকায় সমস্যার সমাধানে কিছুটা হিমশিম খেতে হচ্ছে।

লিফটের অভিযোগ প্রসঙ্গে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২টি লিফট স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি সচল আছে। ৫টি বিকল লিফট আমরা এখনো চালু করতে পারিনি। তবে আমাদের কার্যক্রম চলমান আছে। বিকল লিফটগুলোতে অনেক দামি যন্ত্রাংশ প্রয়োজন, যা টাঙ্গাইলে পাওয়া যায় না; ঢাকা থেকে আনতে হয়। এ বিষয়ে আমি লিফট কোম্পানিকে ইতিপূর্বে অবহিত করেছি। আমাদের রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ বাৎসরিক ব্যয় ধরা আছে মাত্র ১২ লাখ টাকা। এই টাকা ১২টি লিফট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিতান্তই অপ্রতুল। তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাকি ৫টি লিফট সচল হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

 


সম্পর্কিত খবর