পঞ্চগড়ে লাইসেন্সবিহীন মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিতে লিভার পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে প্রতারণা করার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
পঞ্চগড়ে স্বাস্থ্য বিভাগের লাইসেন্স না নিয়ে লিভার পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি প্রতারণা করে আসছিল। এতে লিভার পরীক্ষা করতে এসে প্রতারণার শিকার হন এক ভুক্তভোগী রোগী। মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক সৈয়দা নাসরিন মিনু নিজেই প্রতিষ্ঠানটির সব বিষয় দেখভাল করেন।
এ ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে আসা রোগীরা। সেই সাথে স্থানীয়রা প্যাথলজিটি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। এ দিকে স্বাস্থ্য বিভাগ অভিযোগ পেয়ে প্যাথলজিটির বিরুদ্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। ঘটনাটি পঞ্চগড় জেলা শহরের পঞ্চগড়-তেঁতুলিয়া মহাসড়কের আনোয়ার প্লাজার মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের।
সাইদুজ্জামান রেজা নামে এক রোগীর লিভার পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ অভিযোগ করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১০ আগস্ট রবিবার লিভার রোগে আক্রান্ত রোগী সাইদুজ্জামান রেজা পঞ্চগড় মকবুলার রহমান ডায়াবেটিক হাসপাতালে লিভার পরীক্ষা করান। সেখানে তার লিভারের এসজিপিটি (SGPT) পরীক্ষায় ১২৭ ইউ/এল শনাক্ত করা হয়। তার লিভারের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসক তাকে আবারও এসজিপিটি পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। ওই দিনই সাইদুজ্জামান রেজা (৪৪) মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এসজিপিটি পরীক্ষার জন্য রক্ত দেন। সেখানে দেওয়া রিপোর্টে এসজিপিটি মাত্র ২৬.৭ ইউ/এল পাওয়া যায়।
মকবুলার রহমান ডায়াবেটিক হাসপাতালের রিপোর্টের সাথে মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিপোর্টের ব্যবধান অনেক বেশি হওয়ায় মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিকের রিপোর্ট নিয়ে সাইদুজ্জামান রেজার সন্দেহ হয়। পরে লিভারের সঠিক অবস্থা জানতে তিনি আবারও চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। চিকিৎসক তাকে আবারও এসজিপিটি পরীক্ষার পরামর্শ দিলে পরদিন ১১ আগস্ট মঙ্গলবার সঠিক পরীক্ষার জন্য পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে তৃতীয়বারের মতো এসজিপিটি পরীক্ষা করান। সেখানে রিপোর্টে তার এসজিপিটি ১২১ ইউ/এল পাওয়া যায়। এ নিয়ে তার সাথে প্রতারণা করা হয়েছে উল্লেখ করে সাইদুজ্জামান রেজা মঙ্গলবার সকালে পঞ্চগড় সিভিল সার্জন বরাবর মেডিকেয়ার সেন্টারের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে মেডিকেয়ার সেন্টারের পরিচালক সৈয়দা নাসরিন মিনুর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি সাংবাদিকের কণ্ঠ শুনেই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। এ সময় তিনি সাবেক বিচারপতি মনসুর এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরের আত্মীয় বলে পরিচয় দেন এবং সাংবাদিকদের বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন। পরে তিনি দাবি করেন, তাদের ডায়াগনস্টিকের দেওয়া রিপোর্টে কোনো ভুল নেই।
এদিকে সাংবাদিকরা অনুসন্ধান করে জানতে পেরেছেন, লিভারের প্রদাহ শনাক্তের জন্য 'ফুল অটোমেটিক' এবং 'সেমি অটো' মেশিন ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে মেডিকেয়ার সেন্টারে এখনো পুরোনো 'সেমি অটো' মেশিন দিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে। সেই সাথে ভুক্তভোগী সাইদুজ্জামান রেজার ডায়াবেটিক সমিতি এবং মেডিকেয়ার সেন্টারে কর্মরত টেকনোলজিস্ট একই ব্যক্তি—আবুল বাশার। তিনি একজন ডিপ্লোমাধারী টেকনোলজিস্ট। এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—একই টেকনোলজিস্ট কেন একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করে দুই ধরনের রিপোর্ট দেবেন?
জানা গেছে, আবুল বাশারের দেওয়া টেকনোলজিস্ট রিপোর্ট নিয়ে চলতি বছরেই নানা গড়মিলের অভিযোগ উঠেছিল। এ নিয়ে তাকে পঞ্চগড় মকবুলার ডায়াবেটিক সমিতি থেকে সাময়িক বহিষ্কারও করা হয়। বর্তমানে পঞ্চগড়ের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক জগতে একক আধিপত্য বিস্তার করছেন তিনি।
পঞ্চগড় সিভিল সার্জন ডা. মিজানুর রহমান জানান, "মেডিকেয়ার সেন্টারের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।" অভিযোগকারী লিভারের রোগীর পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালসহ তিন প্রতিষ্ঠানে করানো এসজিপিটি পরীক্ষার মধ্যে মেডিকেয়ার সেন্টারের রিপোর্টটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছেন তিনি।