বরিশাল

পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধ এবং সুন্দরবন রক্ষায় অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মশালা

হেলভেটাস কো-অপারেশন ও জার্মান সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা 'রূপান্তর'-এর বাস্তবায়নে ‘ইকো সুন্দরবন’ প্রকল্পের আয়োজনে এক অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯ মে মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় বরগুনার বামনা উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধ এবং সুন্দরবন রক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

 

বর্তমানে পরিবেশ ও বায়ুদূষণ প্রতিরোধে স্থানীয় তৃণমূলের বাজার থেকে কেনাকাটা, খাদ্য প্যাকেজিং কিংবা ঘরের বিভিন্ন কাজে পলিথিনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে দেখা যায়। কিন্তু এই বহুল ব্যবহৃত বস্তুটি পরিবেশের জন্য এক বিশাল বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব এবং এর ব্যবহার বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এখনই আমাদের চিন্তা-ভাবনা করা উচিত।

 

পলিথিন মূলত পলিমারজাতীয় এক ধরনের প্লাস্টিক, যা মাটির মধ্যে শত শত বছরেও পচে না। এটি জমির গুণগত মান নষ্ট করে এবং মাটির উর্বরতা কমিয়ে দেয়; ফলশ্রুতিতে ফসলের উৎপাদন হ্রাস পায়। পলিথিনের কারণে মাটি তার স্বাভাবিক পানি শোষণ ক্ষমতা হারায়, ফলে জমিতে পানি জমে থেকে ফসলের ক্ষতি হয়। এছাড়া পলিথিন বর্জ্য পানির সাথে মিশে গিয়ে নদী, সমুদ্র এবং অন্যান্য জলাশয়ের পানি দূষিত করছে। পলিথিনের অংশবিশেষ মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীরা খাবার ভেবে খেয়ে ফেলে, যা তাদের হজমতন্ত্রের ভেতরে আটকে গিয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সামুদ্রিক কচ্ছপ, মাছ এবং পাখি পলিথিন খাওয়ার ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে পলিথিন পুড়িয়ে ফেলা হলে বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এই গ্যাসগুলো পরিবেশের ক্ষতি করে এবং মানুষের শ্বাসযন্ত্রের রোগসহ নানা শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ডাইঅক্সিন ও ফিউরানের মতো ক্ষতিকর পদার্থগুলো ফুসফুসের রোগ এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

 

গবেষণায় দেখা গেছে, পলিথিনের ক্ষুদ্র কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের খাবার ও পানিতে মিশে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে, যা ক্যানসারসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কর্মশালায় বক্তারা বলেন, “যদি জনগণ তাদের আচরণ পরিবর্তন না করে, তবে সরকার একা এই যুদ্ধে জিততে পারবে না। প্লাস্টিকের এই মাইক্রোপার্টিকলগুলো শরীরে বিষক্রিয়া তৈরি করছে, যা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে। একজন মা কিংবা বাবা হিসেবে এ ধরনের ক্ষতিকর অভ্যাস বন্ধ করা জরুরি।”

 

তারা আরও বলেন, পলিথিনের বিকল্প সবসময়ই ছিল, কিন্তু সেগুলো ব্যবহার করতে আমাদের অভ্যাসগত অনীহা রয়েছে। আমাদের দাদা বা বাবারা বাজারে গেলে চটের ব্যাগ নিয়ে যেতেন। কিন্তু এখন সামান্য কেনাকাটাতেই পলিথিনের ওপর নির্ভরতা অনেক বেড়ে গেছে। এটা শুধু আমাদের পরিবেশ নয়, আমাদের সংস্কৃতিকেও দূষিত করছে। পলিথিনের সঙ্গে যুক্ত রাসায়নিক পদার্থগুলো শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করার জন্য আমাদের বিকল্প পণ্য বেছে নেওয়া উচিত। কাপড়ের ব্যাগ, পাটের ব্যাগ, কাগজের ব্যাগ এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণগুলো পলিথিনের চেয়ে অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব।

 

কর্মশালায় উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, রাজনৈতিক সংগঠন, সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মীরা অংশ নেন। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন রূপান্তরের জেলা প্রতিনিধি মো. খলিলুর রহমান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোসা. নিকহাত আরা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বামনা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. পলাশ আহমেদ, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসিব, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. মনির হোসেন সজিব, উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী বিপুল কুমার বিশ্বাস, বামনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) প্রতিনিধি পরিদর্শক (তদন্ত) মো. সাইফুল ইসলাম এবং উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সালাহউদ্দিন হাওলাদার। সভায় ‘ইকো সুন্দরবন’ প্রকল্পের জেলা সমন্বয়কারী অনুপ রায় ও ফিল্ড অফিসার আদিবা সুলতানা প্রকল্পের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরেন।

 

আলোচনায় বক্তারা বলেন, পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণের কারণে নদী-খাল, বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা। সেই সাথে প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, বিকল্প পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে সুন্দরবন রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশবাদী সংগঠন ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করার অনুরোধ জানান বক্তারা।



সম্পর্কিত খবর