দেশের খবর

বরিশালে বাড়ছে বিচ্ছেদ

 

বরিশাল জেলায় বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় নয়টি তালাকের আবেদন জমা পড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, তালাকের প্রবণতা শুধু সংখ্যার ঊর্ধ্বগতি নয়, বরং তা বর্তমান সামাজিক সম্পর্কের ভেতরে চলমান তীব্র মানসিক চাপ, দূরত্ব ও ভাঙনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

বিগত ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময়ে জেলায় মোট ৩২ হাজার ১৩টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। তবে এর বিপরীতে একই সময়ে দাম্পত্য সম্পর্কের ইতি ঘটেছে ১০ হাজার ৭৩৮টি। অর্থাৎ, নিবন্ধিত বিয়ের তুলনায় বিচ্ছেদের হার বাড়ছে। ২০২৩ সাল: নয় হাজার ৬৬৬টি বিয়ের বিপরীতে বিচ্ছেদ ঘটে তিন হাজার পাঁচটি।  ২০২৪ সাল: আট হাজার ৯৭৮টি বিয়ের বিপরীতে বিচ্ছেদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৩৪৭টিতে।

 

 

২০২৫ সাল: ১৩ হাজার ৩৬৯টি বিয়ের বিপরীতে চার হাজার ৩৮৬টি বিচ্ছেদ নিবন্ধিত হয়।

 

জেলা রেজিস্ট্রার মো. মোহছেন মিয়া জানান, তালাক আবেদনকারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা অনেক বেশি। সামাজিক মূল্যবোধের ইতিবাচক পরিবর্তন না হলে এ প্রবণতা ২০২৬ সালেও অব্যাহত থাকতে পারে, এমনকি আরও বাড়তে পারে।

সমাজবিজ্ঞানী ও বিশ্লেষকদের মতে, পারিবারিক দূরত্ব, মানসিক অমিল এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দাম্পত্য জীবনকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এছাড়া অবিশ্বাস, উচ্চাভিলাষী জীবন প্রত্যাশা এবং যৌতুকের চাপ সম্পর্কগুলোকে টিকতে দিচ্ছে না।

 

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের পর দ্রুত আবেগের বশে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তবে বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা না থাকায় খুব দ্রুতই সেই সম্পর্কগুলো ভেঙে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি পারিবারিক নির্যাতন, পরকীয়া, অনলাইন জুয়া, মাদকাসক্তি এবং স্বামীর বেকারত্ব বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। কিছু ক্ষেত্রে স্ত্রীর দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতাও সম্পর্ক ভাঙনের কারণ হিসেবে সামনে আসছে। 

 

শিক্ষাবিদ ও সামাজিক সংগঠক অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, অনেক বিয়ে এখন পারস্পরিক বোঝাপড়া ছাড়া কেবল আবেগ ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে হচ্ছে। ফলে খুব দ্রুতই সম্পর্কে ফাটল ধরছে, যার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সন্তান ও পারিবারিক স্থিতিশীলতার ওপর।

 

একই বিষয়ে ব্লাস্ট বরিশাল কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট শাহিদা তালুকদার মনে করেন, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে মানুষের দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতাই এ পরিস্থিতিকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

 

আদালত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দিন দিন পারিবারিক মামলা ও অভিযোগের সংখ্যা বাড়ছে। 

 

অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম জানান, আইনি লড়াইয়ে আসা অভিযোগগুলোর একটি বড় অংশেই বর্তমানে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের (পরকীয়া) কথা উঠে আসছে।

 

সমাজ সচেতন মহলের মতে, এ সামাজিক বিপর্যয় রুখতে পারিবারিক কাউন্সেলিং, বিয়ের পূর্বে পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

 



সম্পর্কিত খবর