খুলনা

নড়াইলে গা ঘেঁষে মসজিদ-মন্দিরের অবস্থান, সম্প্রীতির বন্ধনে প্রায় ৪৫ বছর ধরে চলছে দুর্গোৎসব

নড়াইলে উৎসবমুখর পরিবেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই জেলায় রয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। এখানে অন্তত ১৫টি এলাকায় গা ঘেঁষে মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান সম্প্রীতির উজ্জ্বল নজির সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে জেলা শহরের মহিষখোলা এলাকায় মসজিদ ও মন্দিরের পাশাপাশি অবস্থান। এখানে সম্প্রীতির বন্ধনে প্রায় ৪৫ বছর ধরে চলছে দুই ধর্মের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে নেই কোনো হিংসা-বিদ্বেষ; বরং যুগ যুগ ধরে ধর্ম পালনে একে অপরকে সহযোগিতা করে আসছেন সবাই।

জেলা শহরের মহিষখোলা সর্বজনীন পূজামণ্ডপের সহসভাপতি প্রলয় কুমার ভৌমিক বলেন, “মহিষখোলায় একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান। এটি সারা দেশের মধ্যে অনন্য নজির। এ নিয়ে দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে কখনো মতবিরোধ হয়নি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে যার যার ধর্ম পালন করছেন। নামাজ ছাড়াও মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন একই মাঠ ব্যবহার করে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করছেন, আবার আমরা পূজার কাজে মাঠ ব্যবহার করছি। একেবারে পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান।”

মসজিদের ইমাম হাফেজ মো. এনামুল হক জানান, মহিষখোলা সর্বজনীন পূজামণ্ডপ এবং পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদটি একই জায়গায় অবস্থিত। আমাদের নামাজের সময় তারা পূজা-অর্চনার অনুষ্ঠান বন্ধ রাখে। নামাজ শেষ হলে তারা তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুরু করে। এখনো পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি, আশা করছি ভবিষ্যতেও হবে না।

মহিষখোলা সর্বজনীন পূজামণ্ডপের সাধারণ সম্পাদক শুভঙ্কর বলেন, “দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে আমাদের পূজামণ্ডপ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মসজিদটি পাশাপাশি অবস্থান করছে। যে যার ধর্ম পালন করছেন। আজানের সময় আজান হচ্ছে, আবার পূজার অনুষ্ঠানও হচ্ছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় আমরা একে অপরকে সহযোগিতা করে আসছি। মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের ধর্মীয় বিধি-বিধান সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পালন করে আসছেন।”

পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন মফিজুর রহমান বলেন, “আল কোরআনের সুরা কাফিরুনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন'। অর্থাৎ 'তোমাদের ধর্ম তোমাদের এবং আমার ধর্ম আমার'।” তিনি আরও বলেন, “যে দেশে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সে দেশে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা মুসলিমদের কাছে আমানত। ডিমের ভেতরে কুসুম যেমন নিরাপদ, তেমনি তারা (অমুসলিমরা) নিরাপদে থাকবে। আমরা সেভাবেই তাদের নিরাপদে রাখার চেষ্টা করি।”

শহরের ভওয়াখালী মিতালী সংঘের পূজারী তন্দ্রা মুখার্জি বলেন, “আমাদের নড়াইলে দারুণ একটি উদাহরণ হলো—মহিষখোলা ছাড়াও জেলার অনেক স্থানে মসজিদ ও মন্দিরের পাশাপাশি অবস্থান। এখানে মুসলিম এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। আমরা ছোটবেলা থেকে এভাবেই দেখে আসছি।”

এদিকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহিষখোলা এলাকা ছাড়াও অন্তত ১৫টি স্থানে মসজিদ ও পূজামণ্ডপের একেবারে কাছাকাছি অবস্থান রয়েছে। নামাজের সময় হলে পূজামণ্ডপের ঢাক-ঢোল, গান-বাজনাসহ বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান যেমন বন্ধ থাকছে; তেমনি পূজা-অর্চনার সময় মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন ধর্মীয় বিধি-বিধান মেনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব পালনের সুযোগ করে দিচ্ছেন। ফলে নড়াইলে মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মাঝে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক চমৎকার উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট পঙ্কজ বিহারী ঘোষ জানান, এ বছর নড়াইলে ৫৪৩টি মণ্ডপে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চু বলেন, “আমি শহরের যে (মহিষখোলা) ওয়ার্ডের বাসিন্দা, সেখানে আমার বাড়ির পাশেই মসজিদ ও মন্দির মুখোমুখি। এখানে একই মাঠ ব্যবহার করে দুই ধর্মের লোকজন যার যার ধর্ম পালন করছেন। আশা করছি এবারও সবকিছু স্বাভাবিক থাকবে। বিগত সময়ে আমাদের এখানে কোনো সমস্যা হয়নি। দুর্গাপূজা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে নড়াইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে, যাতে কেউ ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে না পারে।”



সম্পর্কিত খবর