মাঝ-আকাশে নয়, মহাশূন্যে কৃত্রিম উপগ্রহে জ্বালানি ভরার ঐতিহাসিক সাফল্য দাবি করেছে চীন। যদিও সেটা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছে আমেরিকা। মহাকাশের আধিপত্য বিস্তারে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে পিছনে ফেলে ‘উড়ছে’ চীন। শুধু তা-ই নয়, অন্তরীক্ষে ভ্রাম্যমাণ কৃত্রিম উপগ্রহে জ্বালানি ভরার ক্ষেত্রে সাফল্য দাবি করে রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছেন বেইজিংয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। বিগত কয়েক দশক ধরে চেষ্টা করেও এই বিষয়ে সাফল্যের দেখা পায়নি আমেরিকা। ফলে, মান্দারিনভাষীদের কীর্তিতে বেজায় অস্বস্তিতে ওয়াশিংটন। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে সন্দেহ প্রকাশ করে একাধিক প্রশ্ন তুলেছে তারা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে মহাকাশ ভিত্তিক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে হংকংয়ের ইংরেজি দৈনিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’। চীনের সরকারি সংস্থা ডিপ স্পেস এক্সপ্লোরেশন এবং চাইনিজ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস-এর গবেষকদের বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছে, একটি দিক নির্ণয়কারী উপগ্রহে জ্বালানি ভরার যুগান্তকারী অভিযানে সাফল্য পেয়েছে বেইজিং। ফলে, ওই মহাকাশযানের জীবনীশক্তি বেড়ে গিয়েছে অন্তত আট বছর। চীনের দিকনির্ণয়কারী ওই কৃত্রিম উপগ্রহের পোশাকি নাম ‘বেইডু ২ জি-৭’। এতে জ্বালানি ভরতে ‘শিজিয়ান-২৫’ নামের একটি মহাকাশযান অন্তরীক্ষে পাঠায় বেইজিং। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এর সাহায্যে ‘বেইডু ২’-এ ১৪২ কেজির প্রোপেল্যান্ট প্রতিস্থাপনে সক্ষম হন মান্দারিনভাষী জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর নিম্নকক্ষে থাকা সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই ‘শিজিয়ান-২৫’ বানিয়েছে ড্রাগনরা। দুনিয়ার তাবড় তাবড় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার নির্মিত কৃত্রিম উপগ্রহের গড় বয়স পাঁচ থেকে ১৫ বছর হয়ে থাকে। সুনির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি নিয়ে মহাশূন্যে যাত্রা করে ওই সব মানববিহীন যান। অন্তরীক্ষে পৌঁছে নির্ধারিত কক্ষপথে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকে সেগুলি। ওই সময় তীব্র গতির কারণে মাঝেমধ্যেই রাস্তা হারিয়ে ফেলে কৃত্রিম উপগ্রহ। তখনই তাদের কক্ষপথে ফেরাতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের প্রয়োজন পড়ে জ্বালানির। অন্তরীক্ষে মাধ্যাকর্ষণ বল শূন্য হওয়ায় সাধারণভাবে বিনা জ্বালানিতেই পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে পারে কৃত্রিম উপগ্রহ। ওই সময় ইঞ্জিনও চালু থাকে না তার। কিন্তু, নানা কারণে প্রায়ই কক্ষচ্যুত হয়ে যায় ওই যান। তা ছাড়া, গতির কারণে মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা পরিস্থিতির মুখেও পড়ে তারা। সেটা এড়াতে তখন তড়িঘড়ি চালু করা হয় ইঞ্জিন। এর সাহায্যে অন্তরীক্ষে রাস্তা পাল্টে ফের নিজের কক্ষপথে ফিরে আসে ওই কৃত্রিম উপগ্রহ। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, মহাকাশে ইঞ্জিন চালু করা মোটেই সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ জ্বালানির। সেটা শেষ হয়ে গেলে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সংশ্লিষ্ট উপগ্রহকে ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করে থাকেন। কিন্তু, এই পদ্ধতিতে দেখা দেয় অন্য সমস্যা। গত কয়েক বছরে অন্তরীক্ষে মাত্রাতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে ‘অকেজো’ কৃত্রিম উপগ্রহের সংখ্যা। সেই জঞ্জাল পরিষ্কার করতে গিয়ে বিশ্বের নামী গবেষণা সংস্থাগুলোর ঘুম ছুটে গেছে। আর তাই সমস্যা সমাধানে বর্তমানে পুনর্ব্যবহারযোগ্য কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরিতে জোর দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একাংশ। এই কাজে চীন এক ধাপ এগিয়ে গেল বলেই মনে করা হচ্ছে। লম্বা দূরত্ব পেরিয়ে সামরিক অভিযান পরিচালনার সময় মাঝ-আকাশে জ্বালানি ভরে যুদ্ধবিমান। সেই একই পদ্ধতিতে মহাশূন্যে একটি কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে অপরটিতে তাদের গবেষকেরা তেল পাঠাতে সক্ষম হয়েছেন বলে দাবি করেছে বেইজিং। চীনা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দাবি, জ্বালানি ভরার জন্য দিকনির্ণয়কারী ‘বেইডু ২’ এবং রক্ষণাবেক্ষণের ‘শিজিয়ান-২৫’ এর গতিবেগ হ্রাস করেন তারা। জ্বালানি প্রতিস্থাপনের সময় সেকেন্ডে ৩৩১.৪৩ মিটার গতিতে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করছিল তারা। একটি সুপার কম্পিউটারের সাহায্যে নিখুঁত ভাবে এই হিসাব কষা হয় বলে জানিয়েছে বেইজিং। ‘বেইডু’র জীবনীশক্তি বাড়াতে গত বছর জানুয়ারিতে শিজিয়ানকে অন্তরীক্ষে পাঠায় চীন। যদিও চীনের এই দাবি পুরোপুরি ভাবে খারিজ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বক্তব্য, গত বছর জানুয়ারিতে পৃথিবীর কক্ষপথে ১২০ ডিগ্রিতে ছিল শিজিয়ান-২৫। জুন আসতে আসতে সেটা ১২৭ ডিগ্রি হয়ে যায়। অন্যদিকে, ১১০ ডিগ্রিতে ঘুরছে বেইডু ২। জ্বালানি ভরার জন্য সেটিকে কক্ষপথ বদল করতে দেখা যায়নি। দু’টি বস্তু দু’জায়গায় থাকলে কীভাবে জ্বালানি প্রতিস্থাপন করল বেইজিং? যুক্তরাষ্ট্রের তোলা এই প্রশ্নে অবশ্য দমে যাওয়ার পাত্র নয় চীন। বেইজিংয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ২০২১ সালে দু’টি কৃত্রিম উপগ্রহের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে সক্ষম হন তারা। তবে, সেই সময় অন্তরীক্ষে জ্বালানি প্রতিস্থাপন করা হয়নি। পাশাপাশি, প্রমাণ হিসাবে ছবি দিতে অস্বীকার করেন তারা। আমেরিকাকে বাদ দিলে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির দৌড়ে রয়েছে রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং জাপান। যদিও কেউই চূড়ান্ত সাফল্য পায়নি। বিশেষজ্ঞদের কথায়, গত কয়েক বছরে আমেরিকা ও চীনের মধ্যে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে মহাকাশ প্রতিযোগিতা। উদাহরণ হিসাবে, পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেটের কথা বলা যেতে পারে। দু’টি দেশের কাছেই রয়েছে ওই প্রযুক্তি। ফলে, একই রকেটে বার বার অন্তরীক্ষে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠাতে সক্ষম হচ্ছে তারা। এতে অনেকটাই কমেছে মহাকাশযাত্রার খরচ।